রমজানে নারীদের ইতিকাফ করার নিয়ম

ইতিকাফ করার নিয়ম , ফজিলত ও রমযানের ইতিকাফ প্রসঙ্গ

ইতিকাফ

 

ইতিকাফ করার নিয়ম ও পরিচিতি: ইতিকাফ শব্দটি আরবী শব্দ العكف (আল-আক্বফু) মূলধাতু থেকে নির্গত। যার অর্থ হলো অবস্থান করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন কাজের উপর মুদাওয়ামাত করা।(অর্থাৎ: নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্বেচ্ছায় ঐ কাজ করতে থাকা,)

 

পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়, বান্দা নিজেকে দুনিয়াবী কোলাহল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর যে কোন ঘর (পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় হয়) এমন যে কোন মসজিদে আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য লাভের আকাঙ্খায় নামাজ-জিকির কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতে নিজেকে মাশগুল রাখাকে।

 

সতর্কতা: আমাদের দেশে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন যারা ইতিকাফ করতে মসজিদে বসেন।

কিন্তু ইতিকাফ অবস্থায় তারা তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিভিন্ন অপ্রোয়জনীয় কথা-বার্তায় মেতে থাকেন।

কখনো কখনো তো গীবত এবং অন্যান্য হারাম কথায় ও লিপ্ত হয়ে পড়েন। যা ইতিকাফ কারীর জন্য অকাম্য ও অনুচিত।

আসলে ইতিকাফ করার নিয়ম তো হলো বান্দা নিজেকে দুনিয়াবী সকল কাজ-কর্ম ও মানুষের কোলাহল থেকে নিজেকে দূরে রেখে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদাতের নিমিত্তে মসজিদে অবস্হান করা।

হ্যাঁ তবে এই ক্ষেত্রে ইতিকাফকারীর জন্য অন্যদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা ও দ্বীনি আলাপ-আলোচনা করা সম্পূর্ণ বৈধ।

 

 

ইতিকাফের নিয়ত

 

ইতিকাফের আরবী নিয়ত বাংলা উচ্চারণসহ.

নিয়ত ( النية ) এটি একটি আরবী শব্দ যার অর্থ হলো, ইচ্ছা করা বা সংকল্প করা।

পরিভাষায় নিয়ত বলা হয় কোন কাজ সম্পাদন করার জন্য মনে মনে সংকল্প করা, যার জন্য মুখে কোন বাক্য উচ্চারণ করার প্রয়োজন বা আবশ্যকীয়তা নেই।

তবুও আমরা এখানে ইতিকাফ করার নিয়ত আরবীতে উল্লেখ করলাম, তার বাংলা উচ্চারণসহ।

ইতিকাফের উদ্দেশ্যে মসজিদে প্রবেশের সময় নিয়তকে শব্দে প্রকাশ করে এইভাবে বলতে পারেন।

 

بِسْمِ اللهِ وَالصَّلوٰةُ والسَّلَامُ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ نَوَيْتُ أَنْ أَعْتَكِفُ سُنَّةَ الإِعْتِكَافِ اللهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ•

 

বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াস সলাতু ওয়াস সালামু আ’লা রাসূলিল্লাহি (সা.) নাওয়াইতু আন আ তাকিফু সুন্নাতাল ইতিকাফি, আল্লাহুম্মাফ তাহলি আব ওয়াবা রাহমাতিক।

 

বাংলা অনুবাদ: আমি আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল (সা.) এর উপর।

(হে আল্লাহ ) আমি নিয়ত করিতেছি যে, এখন থেকে আমি ইতিকাফ করবো, সুন্নাত ইতিকাফ করবো। (আপনার ইবাদাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করবো)

জেনে রাখুন ইতিকাফ দুই প্রকার: ১. সুন্নাত ইতিকাফ (যা শুধু পবিত্র রমজান মাসের সাথে খাস) ২. নফল ইতিকাফ (যা সারা বছরের যে কোন সময় করা যায়)

নোট: ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। আপনি চাইলে ৫/১০ মিনিট বা সারা দিন ইতিকাফের নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করতে পারেন।

এতে লাভ হলো আপনি যতক্ষণ মসজিদে অবস্থান করবেন, ততক্ষণ আপনার আমল নামায় সাওয়াব লিখা হবে। আর মসজিদে অবস্থান কালীন অন্যান্য  ইবাদাতের সাওয়াব তো আলাদা লিখা হবে।

(উপরোক্ত আলোচনা থেকে ইতিকাফ করার নিয়ম ও ফজিলত জানা হয়ে গেল, এখন আমরা রমজানে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফাজায়েল সম্পর্কে জানবো।)

 

 

 

রমযান মাসে ইতিকাফ করার ফজিলত ও তাৎপর্য

 

ইতিকাফ করার নিয়ম ফজিলত ও রমযানের ইতিকাফ প্রসঙ্গ

রমযান মাসের শেষ দশক হলো অত্যন্ত তাৎপর্য পূর্ণ সময়। রমযানের একটি বিশেষ আমল হচ্ছে সুন্নত ইতিকাফ করা।

আর পবিত্র রমযান মাসে ইতিকাফ করার মূখ্যম সময় হলো রমযানের শেষ দশক।

রমযানের কল্যাণ ও বরকত লাভের ক্ষেত্রে ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। যার মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভ করবার সম্ভাবনাও থাকে বেশি।

যেই রাতকে কুরআনুল কারীমে হাজার মাসের রাত্র থেকে উত্তম রাত্র বলে ঘোষণা করে হয়েছে ।

(যা ইবাদাতের শ্রেষ্ঠত্বতার দিক থেকে উত্তম) 

 তাই নবী কারীম (সা.) রমযানের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

এজন্য রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাদাহ কিফায়াহ।

যা মহল্লার যে কোন এক ব্যক্তির আদায় করার দ্বারা অন্যরা দায়মুক্ত হয়।

কিন্তু যদি মহল্লার কেউ ইতিকাফ আদায় না করে, তাহলে সকলে গুনাহগার হবে। 

রমযান মাস বরকতময় ও নাজাতের মাস এই মাসে সকল ইবাদাতের রয়েছে এক্সট্রা সাওয়াব।

তাই আমরা শেষ দশক ছাড়া ও বাকি দিনগুলোতে ইতিকাফ করার যথেষ্ট চেষ্টা করবো।

কারণ যে যত বেশি সময় দিতে পারবে তার তত সাওয়াব ও ফায়দা হতে থাকবে।

 

 

রমজান মাসে ইতিকাফের প্রতি নবী কারীম (সা.) এর গুরুত্বারোপ

 

সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সর্বদা লাইলাতুল কদর লাভের উদ্দেশ্যে (তার নিকট এই ব্যাপারে ওহাব পূর্বে) তিনি রমজানে ইতিকাফ করতেন।

প্রথমে তিনি রমজানের প্রথম দশকে ইতিকাফ করেন। এরপর দ্বিতীয় দশকে ইতিকাফ করেন।

তারপর জিবরাঈল (আ.) তাকে বলেন। লাইলাতুল কদর হলো রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রীতে।

এরপর থেকে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন।

এবং তার ওফাতের পর তার পরিবারের সদস্য ও সাহাবীগণ সর্বদা তা পালন করেছেন।

এমনকি নবী কারীম (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করাকে এতোটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে,

একবার কোনো কারণে তিনি রমযানে ইতিকাফ করতে অক্ষম হলে, পরবর্তীতে তিনি তা শাওয়াল মাসে কাযা করেন।

 

নবী কারীম (সা.) প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।

 

 উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন

عَنْ  عَائِشَةَ رض قَالَتْ [ أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ، حَتّى تَوَفّاهُ اللهُ عَزّ وَجَلّ، ثُمّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ] .

 

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।

নবীজীর পর তাঁর পরিবারও (সাহাবীগণ) ইতিকাফ করতো। 

তথ্যসূত্র অনলাইন: সহীহ মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ১১৭২  সহীহ বুখারী শরীফ, হাদীস নং ২০২৬

 

হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন

 

 عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رض قَالَ  كَانَ يَعْرِضُ عَلَى النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ القُرْآنَ كُل عَامٍ مَرّةً، فَعَرَضَ عَلَيْهِ مَرّتَيْنِ فِي العَامِ الّذِي قُبِضَ فِيهِ، وَكَانَ يَعْتَكِفُ كُلَّ عَامٍ عَشْرًا، فَاعْتَكَفَ عِشْرِينَ فِي العَامِ الّذِي قُبِضَ فِيهِ.

 

জিবরীল প্রতি বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার কুরআন শোনাতেন।

কিন্তু যে বছর তাঁর ওফাত হয় সে বছর দুই বার শোনান।

নবীজী প্রতি বছর দশ দিন (রমজানের শেষ দশ দিন) ইতিকাফ করতেন। কিন্তু ইন্তেকালের বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেন।

তথ্যসূত্র অনলাইন: সহীহ বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৪৯৯৮২০৪৪

 

 

 

পবিত্র লাইলাতুল কদর কখন!

 

উপরে আমরা যেমনটি উল্লেখ করেছিনবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে বলেছেন।

তবে মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন তা রমজানের দেশ দশকের বিজোড় রাত্রি গুলোতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। যা বিভিন্ন হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়।

লাইলাতুল কদরের খায়ের ও বরকত লাভের জন্য রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম।

ইতিকাফকারী দুই দিক থেকে লাভবান হয়ে থাকে।

১. আখিরাতের দিক থেকে লাভবান ২. দুনিয়াবী দিক থেকে লাভবান

আখিরাতের লাভ হলো সে অন্যান্য আমল করতে না পারলেও শুধু মসজিদে অবস্থান করার দ্বারা নেকি অর্জন করতে থাকে, কারণ ইতিকাফে বসে থাকাটাও একটা স্বতন্ত্র আমল।

আর অন্যান্য আমলের জন্য তো ভিন্ন সওয়াব রয়েছেই। তাই শুধু মসজিদে অবস্থান করার মাধ্যমেই সে সহজে লাইলাতুল কদরের খায়ের ও কল্যাণ লাভ করছে।

দুনিয়াবী লাভ হলো, সে শুধু মসজিদে অবস্থানের কারণে বাইরের বহু ফেতনা ফাসাদ থেকে সে বেঁচে যাচ্ছে।

এবং ডিপ্রেশন ও কোনো প্রকার ঝামেলার সম্মুখীন হওয়া থেকেও মাহফুজ থাকছে।

আর বিস্তর গুনাহের এ যামানায় বহু গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং রোযার যাবতীয় শর্ত ও আদব রক্ষা করা সহজ হয় যখন আল্লাহর ঘর মসজিদে ইতিকাফ করা হয়।

আপনি যদি চাকরীজীবি হয়ে থাকেন বা খুব ব্যস্ত মানুষ হোন কিংবা আপনার হিম্মতের কমতি থাকে ।অথবা অন্য কোনো মাকুল ওযর ইতিকাফের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সেক্ষেত্রে পুরো রমযান মাস বা শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে না পারলেও আপনার পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয় ততটুকু হলেও করুন। 

বিশেষ করে সারাদিনের কর্মব্যস্ততা থেকে ফারেগ হয়ে কমপক্ষে বেজোড় রাতগুলোতে যদি নফল ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা হয় তবুও তো লাইলাতুল কদরের রহমত বরকত লাভের আশা করা যায়।

তাই পুরো সময় না পারলেও যে যতটুকু পারি ততটুকু সময় মসজিদের পরিবেশে থাকি রমজানের রহমত বরকত হাসিল করি।

এটাও আমার আপনার জীবনে অনেক কল্যাণ বয়ে আনবে।(জাহান্নাম থেকে) মুক্তির খাতায় নাম লিখা ও হয়ে যেতে পারে।

 

 

মহিলাদের ইতিকাফ করার পদ্ধতি

 

রমজানে নারীদের ইতিকাফ করার নিয়ম

মহিলাগণ যদি তাদের সাংসারিক ব্যস্ততা থেকে ফারেগ থাকেন।

এবং ঘরে অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা বাচ্চাকাচ্চার সেবাশুশ্রষার প্রসঙ্গ না  থাকে, তাহলে তারাও ইতিকাফ করতে পারেন।

হ্যাঁ তবে তার স্বামী যদি বাসায় উপস্থিত থাকে তার অনুমতি নিয়ে ইতিকাফে বসা উত্তম।

নারীদের জন্য ইতিকাফ করার নিয়ম হলো,

বাসায় নামাযের জন্য নির্ধারিত থাকা স্থানকে ইতিকাফের স্থান নির্ধারণ করবে।

যদি নামাযের জন্য নির্ধারিত কোনো জায়গা না থাকে, তাহলে বাসার যে কোনো একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে ইতিকাফের জন্য বসতে পারেন।

তবে এই ক্ষেত্রে এমন জায়গা নির্বাচন করবে যাতে কোন প্রকার শোরগোল বা বাচ্চাদের আনাগোনা না থাকে।

অর্থাৎ নিরিবিলি যে কোন জায়গাকে ইতিকাফের জন্য নির্বাচন করবে, যাতে করে ইবাদাতে কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে।

উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে মাবোনরা ইতিকাফ করলে তারাও ইতিকাফের সাওয়াব এবং লাইলাতুল কদরের ফযীলত লাভ করতে পারবেন। ইনশা-আল্লাহ

 

আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে লাইলাতুল কদর ভাগ্য নসীব করুন। এবং রমজানের বরকত ও মাহাত্ম্য অর্জন করে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ দান করুন।

আমীন! আমীন!

 

পবিত্র রমযানে ওমরা পালনের ফজিলত সম্পর্কে পড়ুন।

আরো ইসলামিক পোস্ট পড়ুন।

 

3 thoughts on “ইতিকাফ করার নিয়ম , ফজিলত ও রমযানের ইতিকাফ প্রসঙ্গ”

Leave a Comment

Your email address will not be published.