ঈদের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত

ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাব সমূহ | এবং ঈদের নামাজের নিয়ম

ঈদুল ফিতর পরিচিতি

 

নিম্মে আমরা ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাব কাজগুলো কি কি, তা বিস্তারিত উল্লেখ করবো।

প্রথমে আমরা জানবো ঈদুল ফিতরের পূর্ণ (মিনিং) বা অর্থ এবং তৎ-সম্পর্কীয় মাসআলা-মাসায়েল।

‘ঈদ’ এটি একটি আরবি শব্দ যা اَلْعَوْدُ (আল-আউদু) শব্দমূল থেকে গঠিত। এর অর্থ হলো ফিরে আসা, বারবার ফিরে আস, এমন জিনিষ যা বারবার ফিরে আসে।

ঈদ যেহেতু আমাদের মাঝে বারবার ফিরে আসে, তাই বছরের নির্দিষ্ট এই দু’টি দিনকে ঈদ বলা হয়।

‘ফিতর’ এটিও একটি আরবী শব্দ যার অর্থ হলো ভেঙে দেওয়া, ভেঙে ফেলা, ইফতার করা।

পবিত্র মাহে রমজানে পূর্ণ এক মাস ২৯/৩০ দিন সীয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন আল্লাহর হুকুম রোজা ভঙ্গ করা বা ইফতার করার দিন।

যার জন্য ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কিছু খেয়ে নেওয়া ঈদুল ফিতরের সুন্নাত।

এবং এই দিন নফল রোজা রাখা পর্যন্ত (হারাম) মাকরুহে তাহরীমি।

যেহেতু মু’মীন ব্যক্তি দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন রোজা ভঙ্গ করে, তাই ঈদুল ফিতরকে ঈদুল ফিতর বলা হয়।

ঈদুল ফিতর হলো সে আনন্দঘন উৎসব মূখর সময় যা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর বছরে একবার আসে। আসে সুশৃঙ্খল শৃষ্টাচারের তীর ঘেঁষে।

নৈতিক, আত্মিক ও সামাজিক বৈরীতা এবং ধনী-গরীবের বেধাবেদ ভুলিয়ে দিয়ে আসে পরিশুদ্ধির কল্যাণ নিয়ে।

মুসলিমের ঈদ আসে তাকওয়ার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন জীবনে ফেরার অঙ্গীকার নিয়ে।

পবিত্র মাহে রমজানের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সঙ্গে আলিঙ্গন করে ঈদ আসে।

ঈদ আসে মহামিলনের মহা উৎসবে মনকে মাতিয়ে তুলতে, পরিশোধিত অন্তরে পরিতৃপ্তির ছোঁয়া লাগাতে।

 

 

 

ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাব সমূহ

 

ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাব সমূহ

 

১. ঈদের দিন অন্য দিনের তুলনায় প্রত্যুশে ঘুম থেকে উঠা, এবং ফজর নামাজ আদায় করে না ঘুমানো (সুন্নাত)। যাতে করে ঈদের আনন্দটা পূর্ব থেকে অনুভব করা যায়।

 

২. মিসওয়াক করা সুন্নাত।

 

৩. ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করা সুন্নাত।

 

৪. সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা সুন্নাত।

 

৫. কোন কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। হ্যাঁ বিজোড় সংখ্যায় যেকোনো মিষ্টিদ্রব্য খাওয়া উত্তম; তবে খেজুর খাওয়া অতি উত্তম।

 

৬. সকাল সকাল ঈদগাহে গমণ করা এবং প্রথম কাতারের দিকে এগিয়ে বসা।(মুস্তাহাব) তবে ইমাম সাহেবের ক্ষেত্র ভিন্ন তিনি নামাজের পূর্বে আসবেন।

 

৭. ঈদগাহে হেঁটে হেঁটে যাওয়া উত্তম। এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে আসা মুস্তাহাব।

 

৮. ঈদগাহে যাওয়ার পথে নিম্ন আওয়াজে তাকবির বলা ঈদের দিনের সুন্নাত।

اَللّٰهُ أَكْبَرْ أَللّٰهُ أَكْبَرْ لَاإِلٰهَ إِلَّا اللهُ واللهُ أَكْبَرْ أَللهُ أَكْبَرْ وَللهِ الْحَمْدُ•

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ পড়া সুন্নাত।

 

৯. নিজের সাধ্যমত উত্তম ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব।

 

১০. নামাজের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার আগে আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা সুন্নত।

তবে সুবিধামত রমজানের যে কোন সময় আদায় করে দেওয়া ও ভালো। যাতে ফিতরাহ গ্রহীতা তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে।

 

১১. ঈদের দিন চেহারায় খুশির ভাব প্রকাশ করা এবং পরিচিত-অপরিচিত যে কারোর সঙ্গে দেখা হলে হাসিমুখে কথা বলা মুস্তাহাব।

 

১২. আনন্দ-অভিবাদন বিনিময় করা মুস্তাহাব।

 

তথ্যসূত্র: ফাতওয়ায়ে শামী : ১ নং খন্ড পৃষ্টা নং: ৫৫৬, ৫৫৭, ৫৫৮; হিদায়া : ২ নং খন্ড পৃষ্টা নং ৭১; বুখারী শরীফ ১নং খন্ড. পৃষ্টা নং ১৩০

 

 

 

ঈদের নামাজের হুকুম

 

ঈদের নামাজ দুই রাকাত ও অতিরিক্ত ৬টি তাকবীরের সাথে আদায় করা ওয়াজিব।

এতে আজান ও ইকামত নেই। যে সকল লোকদের উপর জুমার নামাজ ওয়াজিব, সে সকল লোকদের উপর ঈদের নামাজও ওয়াজিব।

আর ঈদের নামাজ বড় ময়দানে পড়া উত্তম। তবে মক্কাবাসীর জন্য মাসজিদুল হারামে পড়া উত্তম।

এবং শহরবাসীর জন্য শহরের মসজিদগুলোতেও ঈদের নামাজ আদায় করা জায়েজ আছে।

ঈদের নামাজের পর ইমাম সাহেব দুইটি খুৎবা দিবেন। জু’মার নামাজের খুৎবার ন্যায়।

ঈদের নামাজের পর খুৎবা দেয়া সুন্নাতে মুআক্কাদা আর মুসল্লিদের জন্য চুপ করে খুৎবা শোনা ওয়াজিব।

(এবং ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাবগুলো উপরে লক্ষ্যকরুন।)

তথ্যসূত্র: সহীহ বুখারি শরীফ : ১ নং খন্ড ১৩১ নং পৃষ্ঠা,  ফাতওয়ায়ে শামী : ১ নং খন্ড ৫৫৫ ও ৫৫৭ নং পৃষ্ঠা,

 

 

ঈদের নামাজের সময়

ঈদের নামাজের সময় হলো সকালে সূর্য উদিত হওয়ার পর সূর্য যখন এক বর্শা (অর্ধ হাত) পরিমাণ উঁচু হয় তথা তার আলোকরশ্মি ছড়াতে শুরু করে।

তখন থেকে ঈদের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়। এবং দ্বিপ্রহর (তথা: যোহরের আগ) পর্যন্ত ঈদের নামাজের সময় বাকি থাকে।

 

তবে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে একটু বিলম্ব করে আদায় করাটা সুন্নাত।

যাতে করে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই বেশি থেকে বেশি সদকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র: ফাতহুল কাদির : ২নং খন্ড ৭৩ নং পৃষ্ঠা,  আল-মুগনি : ২নং খন্ড ১১৭ নং পৃষ্ঠা,

 

 

ঈদের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত

 

ঈদের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত

নিয়ত ( النية ) এটি একটি আরবী শব্দ যার অর্থ হলো, ইচ্ছা করা বা সংকল্প করা।

পরিভাষায় নিয়ত বলা হয় কোন কাজ সম্পাদন করার জন্য মনে মনে সংকল্প করা, যার জন্য মুখে কোন বাক্য উচ্চারণ করার প্রয়োজন বা আবশ্যকীয়তা নেই।

ঈদের নামাজের নিয়ত মনে মনে এভাবে নির্দিষ্ট করতে হবে যে আমি ঈদুল ফিতর/আযহার নামাজ কিবলামুখী হয়ে এই ইমাম সাহেবের পেছনে অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সঙ্গে আদায় করছি।

এইটা সংকল্প করলেই নিয়ত হয়ে যাবে, তবে মনের প্রশান্তির জন্য মুখে বলতে পারেন। এতে কোন সমস্যা নেই।

( তবুও আপনাদের সুবিধার্থে এখানে আমরা ঈদুল ফিতরের আরবী নিয়ত বাংলা উচ্চারণসহ উল্লেখ করলাম। এভাবেও নিয়ত করতে পারেন।

ঈদুল ফিতরের আরবী নিয়ত।

 

نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ رَكْعَتَيْ صَلٰوةُ عِيْدُ الـْفِطْرِ وَرَاءَ الْإِمَامِ مَعَ سِتَّةُ تَكْبِيْرَاتٍ وَاجِبَ اللهِ تَعَالٰى مُتَوَجِّهًا إِلٰى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ • 

 

বাংলা উচ্চারণ:

নাওয়াইতু আন-উসল্লি রাকআতাই সলাতু ঈদুল ফিতরি, ওয়ারাআল-ইমামী মাআ সিত্তাতু তাকবীরাতিন, ওয়াজিবাল্লাহি তা’য়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল ক্বাবা-তিশ শারীফাতি।

এরপর ইমামের সাথে তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলে নামাজ শুরু করবে।)

 

ঈদের নামাজে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবির বলা ওয়াজিব।

প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমা এবং ‘ছানা’ পড়ার পর তিনটি তাকবির বলবে।এবং দ্বিতীয় রাকাতে কেরাতের পর রুকুতে যাওয়ার আগে তিনটি তাকবির বলবে।

এই অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীর বলার সময় ইমাম-মুকতাদি সকলে কাণের লতি পর্যন্ত হাত উঠাবে।

প্রথম রাকাতে তৃতীয় তাকবীর বলার পর হাত বাঁধবে আর বাকী তাকবীরগুলো বলার পর হাত ছেড়ে দিবে।

আর দ্বিতীয় রাকাতে ক্বিরাতের পর তিন তাকবীরের প্রত্যেক তাকবীরে হাত ছেড়ে দিবে, ইমাম যখন চতুর্থ তাকবীর বলবে তখন রুকেতে চলে যাবে।

 

 

ঈদের নামাজ বা জামাত ছুটে গেলে করনীয়

 

মাসআলা-১। কেউ যদি ঈদের নামাজের প্রথম কারাতের অতিরিক্ত তিনটি তাকবির না পায়, তাহলে সে রুকুতে থাকা অবস্থায় হাত উঠানো ব্যতীত তা আদায় করে নেবে।

আর কাহারো যদি পূর্ণ এক রাকাত ছুটে যায়, তাহলে সে দ্বিতীয় রাকাতে কেরাতের পর এক সাথে অতিরিক্ত তাকবীরগুলো আদায় করে নেবে। তবে তার জন্য ক্বিরাতের আগে আদায় করারও সুযোগ রয়েছে।

নামাজ শেষে খুতবা প্রদান ইমামের জন্য সুন্নত; তা শ্রবণ করা নামাজির জন্য ওয়াজিব।

তথ্যসূত্র: ফাতাওয়ায়ে শামী : ১নং খন্ড ৫৫৯ ও ৫৬০ নং পৃষ্ঠা,

 

মাসআলা-২ । আর কাহারো যদি পূর্ণ ঈদের নামাজ ছুটে যায়, তাহলে সে শহরের অন্য কোনো জামাতে শরিক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পরিশেষে যদি নামাজ ছুটেই যায় তাহলে এর কোনো কাজা নেই।

বি:দ্র: ঈদের নামাজ একাকী পড়া জায়েজ নেই, এবং এর কাযা আদায় করা যায় না।

হ্যাঁ তবে ঐ ব্যক্তি চার রাকাত এশরাকের নফল নামাজ আদায় করে নেবে এবং তাতে ঈদের নামাজের মতো অতিরিক্ত তাকবির বলবে না।

তথ্যসূত্র: ফাতাওয়ায়ে শামী : ১নং খন্ড ৫৬১ নং পৃষ্ঠা,

 

সবাইকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা। ঈদ মুবারাক ২০২২

عِيْدٌ مُبَارَكٌ ، تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ صَالِحَ الأَعْمَالِ

আল্লাহ আমার এবং আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করুক। আমীন!! আমীন!!

 

 

আরো পড়ুন,

মুসলিমদের কিভাবে ঈদ উদযাপন করা উচিত।

পবিত্র মাহে রমজানে ওমরা পালনের ফজিলত ও তাৎপর্য ।

 

আমাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট দেখুন।

1 thought on “ঈদের দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাব সমূহ | এবং ঈদের নামাজের নিয়ম”

  1. Pingback: মুসলিমদের ঈদ উদযাপন কেমন হওয়া উচিৎ

Leave a Comment

Your email address will not be published.