মুসলিমদের ঈদ উদযাপন কেমন হওয়া উচিৎ

মুসলিমদের ঈদ উদযাপন কেমন হওয়া উচিৎ

ঈদের আনন্দ উদযাপন

 

ঈদ মানে কি? আমরা কিভাবে ঈদ উদযাপন করবো ? (ঈদের শব্দ বিশ্লেষণ দেখুন) ঈদ মানে খুশি-আনন্দ ঈদ হলো সেই আনন্দঘন মূহুর্ত।

যা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বছরে দুইবার আমাদের সামনে উপস্থিত হয়।

বিশেষ করে ঈদুল ফিতর দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মু’মীন বান্দার জন্য আল্লাহর দেয়া একটি সেরা উপহার। যাতে সে রোজা ভঙ্গ করে আনন্দ প্রকাশ করে ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে মজবুত করে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে অনেক মানুষই বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়েন।

আতশ-বাজি ও অন্যান্য অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে পড়েন। যা আদৌ মুসলিমের শান নয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

قوله تعالى: كُلُوا وَاشْرَبُوْا وَلاَ تُسْرِفُوْا… إلى آخر الآية سورة الأعراف ٣١ آية

হে আমার বান্দাগণ তোমরা আমার দেয়া রিযিক থেকে খাও পান কর. এবং কোনপ্রকার অপচয় করো না।

আমাদের পূর্বানুসারীগণ ঈদের আনন্দ উদযাপনে সর্বদা ইসরাফ করা ও (অযথা খরচ ও গুনাহের কাজে খরচ) গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকতেন।

তারা এই বিষয়ে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন, এবং গুনাহ থেকে নিজেদের হেফাজত রাখতেন।

হযরত ওয়াকী ইবনুল জার্রাহ রাহ. বলেন, আমি এক ঈদে হযরত সুফিয়ান সাউরী রাহ.এর সাথে বের হলাম। তিনি বললেন

إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ يَوْمَنَا  غُصُّ أَبْصَارُنَا• 

আজকের দিন যে কাজের মাধ্যমে আমরা ঈদের আনন্দের সূচনা করব তা হল আমাদের দৃষ্টির  হেফাযত।

তথ্যসূত্র: কিতাব আলওয়ারা ইবনে আবিদ দুনিয়া, পৃ. ৬৩ (৬৬)

আবু হাকীম রাহ. বলেন, হাস্সান ইবনে আবু সিনান রাহ. ঈদের নামাযে বের হলেন।

নামায থেকে ফিরে এলে তার স্ত্রী তাকে দৃষ্টির গুনাহ থেকে বেঁচেছেন কি না জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন

 

وَيْحَكِ مَانَظَرْتُ إِلَّا فِيْ إِبْهَامَيَّ مُنْذُ خَرَجْتُ مِنْ عِنْدَكِ حَتّٰى رَجَعْتُ إِلَيْكِ •

কী বলছ! ঘর হতে বের হওয়া থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত দৃষ্টি কেবল পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির প্রতি নিবদ্ধ ছিল।আমি এই ছাড়া অন্য কোনদিকেই তাকাই নাই।

দেখুন তাদের ত্বাকওয়ার মর্তবা কত উঁচু আর ঈদ উদযাপন করার ক্ষেত্রে কত সাবধানতা অবলম্বন করতেন। 

তথ্যসূত্র: হিলইয়াতুল আওলিয়া ৩/১১৫; আলইল্ম

 ইবনে আবিদ দুনিয়া, পৃ. ৩২ (৬৮)

 

 

আমাদের ঐতিহ্যিক ও পূর্বপুরুষদের ঈদ উদযাপন কেমন ছিলো?

 

ঈদের পূর্বে খলীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. তার শাসনামলে গভর্নরদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বলেন।

তোমাদের মাঝে যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা যেন ঈদের নামাযের আগে সাধ্যানুযায়ী দানসদকা করে।আর যারা অসচ্চল যাদের দান করার সামর্থ্য নেই তারা যেন ঈদের পরে রোযা রাখে।

এরপর তিনি আরো বলেন, ঈদের দিন তোমরা বেশি বেশি বলতে থাকবে, যেমন বলেছিলেন আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম

رَبَّنَا ظَلَمْنَاۤ اَنْفُسَنَا وَ اِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَ تَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ• 

হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজ সত্তার উপর জুলুম করে ফেলেছি।

আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন ও আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অকৃতকার্যদের অন্তভুর্ক্ত হয়ে যাব।

[সূরা আরাফ (৭) ২৩]

 

এবং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মতো এইভাবে দোয়া করতে থাকবে

وَ الَّذِیْۤ اَطْمَعُ اَنْ یَّغْفِرَ لِیْ خَطِیْٓـَٔتِیْ یَوْمَ الدِّیْنِ•

এবং যার কাছে আমি আশা রাখি, হিসাবনিকাশের দিন তিনি আমার অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। [সূরা শুআরা (২৬) : ৮২]

আর হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মতো ইস্তিগফার করতে থাকবে

رَبِّ اِنِّیْ ظَلَمْتُ نَفْسِیْ فَاغْفِرْ لِیْ فَغَفَرَ لَهٗ اِنَّهٗ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِیْمُ.

হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজ সত্তার প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। সুতরাং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা কাসাস (২৮) : ১৬]

তদ্রুপ হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের মতো দোয়া করবে।

তথা দোয়ায়ে ইউনুস পড়বে 

 

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ  اِنِّیْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِیْنَ.

 

বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ যলিমীন। 

 অর্থ: (হে আল্লাহ!) তুমি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নেই। তুমি সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী। [সূরা আম্বিয়া (২১) : ৮৭]  -তথ্যসূত্র: ফাযাইলুল আওকাত, বায়হাকী, পৃ. ৩০৬৩০৭ (১৪৬)

 

 

 

ঈদ উদযাপন ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় পদ্ধতি

 

মুসলিমদের ঈদ উদযাপন কেমন হওয়া উচিৎ

 

মুসলিমদের আদর্শ তো হলো পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ হলো সালাম বিনিময় করা। এটিই তো সর্বোত্তম আদর্শ, এর থেকে উত্তম অভিবাদনের আর কোন পদ্ধতি নেই।

মুসলিমদের এই অভিবাদন পদ্ধতি আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক প্রদত্ত। এই সালামের মাধ্যমে মানুষ পরস্পরের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণের নয় দোয়া করে থাকে। যাহা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিবাদন বলে পরিগণিত হয়।

যখন একে অপরের দেখা হয়, তখন এইভাবে অভিবাদন জানানো হয়।

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته.

আপনাদের (সকলের) প্রতি বর্ষিত হোক সালাম ও শান্তি এবং বর্ষিত হোক আল্লাহর রহমত ও বরকত।

এছাড়াও ইসলামে সালামের রয়েছে আরো অনেক ফযীলত ও গুরুত্বতা।

যেমন, হাদীসে এসেছে, সালামের মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা-আত্মার বন্ধন তৈরী হয়, ঈমানের পূর্ণতা লাভ হয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করার পথ সুগম হয়।

তথ্যসূত্র : হাশিয়া সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫১৯৩

 

অতএব আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানানোর উপায় হল সালাম।

আমরা এই সালামের প্রচার-প্রশার করবো, এবং সালামের পর আমরা একেঅপরের জন্য দুআ করতে পারি।

আরব সভ্যতা

আমি আরব সভ্যতার মাঝে এই উত্তম গুণটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখেছি যে, তারা পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ হলে প্রথমে সালাম বিনিময় করে।

এবং পরে একে অপরের জন্য ও তাদের মাতা-পিতার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া করতে থাকে।

ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম একে অপরের সাক্ষাতে  যে বাক্যগুলোর মাধ্যমে একেঅপরের জন্য দুআ করতেন ও আনন্দ বিনিময় করতেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয়।

আর এতেই নিহীত রয়েছেমুসলিমদের প্রকৃত ঈদ ও ঈদের খুশি উদযাপনে পূর্ণতা লাভের পাথেয়।

আর তা হল, আল্লাহর কবুলিয়াত; তাঁর দরবারে আমাদের আমল কবুল হওয়া এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ হওয়া।

তাই তো সাহাবায়ে কেরামগণ সকলে একে অন্যের জন্য এই কবুলিয়াতের দুআই করতেন।

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহ. বলেন

 

كان أصحاب رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم إِذَا الْتَقُوْا يَوْمَ الْعِيْدِ يَقُوْلُ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ :

تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكُمْ.

ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম মিলিত হলে একেঅপরের জন্য দোআ করে বলতেন

تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكُمْ.

আল্লাহ কবুল করুন আমাদের থেকে এবং আপনাদের থেকে (সকল আমল)।

তথ্যসূত্র: ফাতহুল বারী ২/৪৪৯; আলজাওহারুন্নাকী ৩/৩২০

 

 

আরো ইসলামিক পোস্ট পড়ুন।

ঈদের নামাজের নিয়ম ও ঈদের দিনের সুন্নাত সমূহ

ইসলামে সর্বপ্রথম বৃদ্ধ ভাতা কে চালু করেন।

আমাদের স্বাস্হ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট দেখুন।

1 thought on “মুসলিমদের ঈদ উদযাপন কেমন হওয়া উচিৎ”

Leave a Comment

Your email address will not be published.