সূরা ইখলাস বাংলা উচ্চারণ শানে নুযূল, তাফসীর ও অর্থ

সূরা ইখলাস বাংলা উচ্চারণ | শানে নুযুল, তাফসীর ও অর্থসহ

সূরা ইখলাস

সূরার নাম সূরায়ে “ইখলাস” বা سورة الإخلاص এটি পবিত্র কুরআনুুল কারীমের ১১২ নম্বর সূরা। এই সূরা কুরআনের অন্যতম একটি ছোট সূরা। এর আয়াত সংখ্যা হলো ৪টি এবং রুকুর সংখ্যা হলো ১টি। আর সূরায়ে ইখলাস মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল। (এটি একটি মাক্কি সূরা)

সূরায়ে ইখলাসের আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণ, ইখলাস শব্দের অর্থ হলো- একনিষ্ঠতা, নিরেট খাঁটি বিশ্বাস, খালেছ বিশ্বাস,  ভেজালমুক্ত বিশ্বাস, ভক্তিপূর্ণ উপাসনা।

পারিভাষিক অর্থে ইখলাস বলা হয়, দুনিয়ার সকল বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের ওপর খাঁটি ও নিরেট বিশ্বাসী হওয়াকে ইখলাস বলে।

সুরায়ে ইখলাস বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ

সূরা ইখলাস বাংলা উচ্চারণ শানে নুযূল, তাফসীর ও অর্থ

 (سُوْرَةُ الْإِخْلاَص (مكية

সূরা এখলাস

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرّحِيْمِ•.ب

বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহির র-হমানির রহীম।

١. قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ 

উচ্চারণঃ ১। ক্বুল হুওয়াল্লহু আহাদ।

অর্থঃ বলুন, তিনিই আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়।

قل শব্দের সম্বোধন নবী কারীম সাঃ এর দিকে করে বলা হয়েছে, হে নবী আপনি (মুশরিকদের) বলে দিন। তিনি আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। তার কোন শরীক নেই, তাঁর কোন সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান, অংশীদার কিছুই নেই।

এবং নবী কারীম সাঃ এর ওফাতের পর এই قل শব্দের সম্বোধন ব্যাপক হয়ে সকল মু’মিন মু’মিনাতের উপর অর্পিত হয়েছে। ফলে সকলের জন্যই তাওহীদের বাণী পৌঁছানোর হুকুম বর্তায়।

٢. اَللهُ الصَّمَدُ 

বাংলা উচ্চারণঃ ২। আল্লাহুস-সামাদ ।

অর্থঃ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। (আল্লাহ কখনো কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)

٣. لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ

বাংলা উচ্চারণঃ ৩। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইয়ুলাদ।

অর্থঃ (আল্লাহ) তিনি কাউকে জন্ম দেননি। এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি।

٤. وَلَمْ يَكُن لَّهُ، كُفُوًا أَحَدُ

বাংলা উচ্চারণঃ ৪। ওয়া লাম ইয়াকুল-লাহু কুফু ওয়ান আহাদ।

অর্থঃ এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।

 

সূরায়ে ইখলাসের শানে নুযূল বা অবতীর্ণের কারণ

সূরায়ে ইখলাস অবতীর্ণের কারণ হলো এই যে, মক্কার মুশরিকগণ নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলার বংশ পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল। তথা তার পিতা-মাতা কে? তিনি কোত্থেকে এলেন ইত্যাদি।

এবং কোন কোন বর্ণনা মতে তারা আরও প্রশ্ন করেছিল যে, আল্লাহ তা’আলা কিসের তৈরী, স্বর্ণরৌপ্য নাকি অন্য কিছুর?

তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ঐ সকল শিরকি প্রশ্নের প্রতিউত্তরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ওহীর মাধ্যমে সূরা ইখলাস অবতীর্ণ করেন। এটি হলো সংক্ষিপ্ত আলোচনা, বিস্তারিত জানতে দেখুন সূরা ইখলাস এর তাফসীর।

তথ্যসূত্রঃ তিরমিযী: হ/ন ৩৩৬৪, মুসনাদে আহমাদ: হ/ন ৫/১৩৪, মুস্তাদরাকে হাকিম: হ/ন ২/৫৪০ মুজামুল আওসাত: ৩/৯৬

 

সূরা ইখলাস এর ফজিলত

সূরায়ে ইখলাস পাঠ করার অনেক ফজিলত ও উপকারিতা রয়েছে। তন্মধ্যে আমরা এখানে হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে কয়েক ফজিলতের কথা উল্লেখ করবো।

১। এই সূরা নিয়মিত পাঠেরফলে বালা-মসিবত থেকে নিস্কৃত থাকা যায়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যেই ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করবে তা তাকে সকল বালা-মসিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: আবু দাউদ: হ/ন ৫০৮২, তিরমিযী: হ/ন ৩৫, ৭৫, নাসায়ী: হ/ন ৭৮৫২

২। সূরা ইখলাস এর ভালবাসা জান্নাতে যাওয়ার কারণ হতে পারে। হাদীসে এসেছে, এক সাহাবী নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে আরয করলঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি এই সূরাটি খুব বেশি ভালবাসি। তিনি বললেনঃ এর ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে।

তথ্যসূত্র: মুসনাদে আহমাদ: হ/ন ৩/১৪১, ১৫০ সোর্স

৩। এই সূরা কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। হাদীস শরীফে এসেছে, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমরা সবাই একত্রিত হয়ে যাও। আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শুনাব।

এরপর যাদের পক্ষে সম্ভব ছিল, তারা সকলে নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হয়ে গেলে তিনি আগমন করেন। এবং সকলকে সূরা ইখলাস পাঠ করে শুনান। তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে আরও বলেন এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। তথ্যসূত্র: তিরমিযী: হ/ন ২৯০০

সূরায়ে ইখলাসকে ثلث القرآن বা কুরআনের এক তৃতীয়াংশ বলার কারণ হলো,

এই যে, এই সূরাতে আল্লাহর একত্ত্ববাদ ও উপাসনার কথা বলা হয়েছে, এবং শিরককে আল্লাহর থেকে দুরে রাখা হয়েছে।

এবং এতে কাফেরদের শিরক জনিত সকল প্রশ্নের জবাব প্রদান করা হয়েছে। যার বিস্তারিত বিবরণ কুরআনুুল কারীমের অন্যান্য জায়গায় প্রদান করা হয়েছে। ফলে এটি সংক্ষেপে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ হওয়ায়, নবী কারীম সাঃ সূরা ইখলাসকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ বা ثلت القرآن বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

বিঃদ্রঃ অনেকে ফজিলত বর্ণনায় অতিরঞ্জিত করে বলে থাকে যে, এই সূরা তিনবার পাঠ করলে কুরআন মাজীদ পূর্ণ খতমের সাওয়াব পাওয়া যায়। যার নির্ভরযোগ্য  কোন সূত্র বা দলিল নেই। হাঁ এটি ঠিক যে, এই সূরাটি অনেক মাহাত্ম্য ও তাৎপর্যপূর্ণ সূরা যার অনেক ফজিলত ও রয়েছে। যা আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এখানে উল্লেখ করেছি।

৪। ঘুমানোর আগে এই সূরা পাঠ করার উপর গুরুত্বারোপ। এক হাদীসে এসেছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হে উকবা ইবনে আমের রাঃ আমি কি তোমাকে এমন তিনটি উত্তম সূরা শিক্ষা দিব না। যার মত উত্তম কিছু তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর এবং কুরআনেও নাযিল হয়নি।

উকবা ইবনে আমের রাঃ বলেন, তখন আমি বললাম, অবশ্যই হ্যাঁ, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। উকবা রাঃ বলেন, এরপর নবী কারীম সাঃ আমাকে “কুল হুয়াল্লাহু আহাদ” “কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক” “কুল আউযু বিরাব্বিন নাস” এই তিন সূরাগুলো বা তিন কুল পড়ালেন, তারপর বললেন, হে উকবা! রাত্রিতে তুমি ততক্ষণ নিদ্রা যেয়ো না, যতক্ষণ সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস না পাঠ কর। উকবা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ সেদিন থেকে আমি কখনও এই আমল ছাড়িনি। তথ্যসূত্রঃ মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৪৮, ১৫৮-১৫৯

৫।

এই সূরা পাঠ করা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়মিত আমল ছিল। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন।

তখন তিনি তার দু হাতের তালু একত্রিত করতেন তারপর সেখানে “কুল হুয়াল্লাহু আহাদ” “কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক” এবং “কুল আউযু বিরাব্বিন নাস” এ তিনটি সূরা পড়ে ফুঁ দিতেন, তারপর তার দু হাতের তালু দিয়ে শরীরের যতটুকু সম্ভব মাসেহ করতেন।

তাঁর মাথা ও মুখ থেকে শুরু করে শরীরের সামনের অংশে তা করতেন। এমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার করতেন। তথ্যসূত্রঃ বুখারী: ৫০১৭, আবু দাউদ: ৫০৫৬, তিরমিযী: ৩৪০২

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সুরা ইখলাসের ভাব ও মর্মার্থ বুঝে নিজেদের মধ্যে প্রতিস্থাপন করার তাওফিক দান করুন।

আল্লাহ তাআলার একত্ত্ববাদ ও ক্ষমতায় পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করার তাওফিক দান করুন। হাদিসে ঘোষিত মর্যাদা ও ফজিলত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সূরা ইখলাস এর তাফসীর আমরা পরবর্তীতে পাবলিশ করার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ। এখানে তাফসীর উল্লেখ করতে গেলে লিখা অনেক বড় হয়ে যাবে। সূরা ইখলাস এর তাফসীর পড়ুন এই লিংক করা পোস্টে।

আরো পড়ুনঃ সাইয়েদুল ইস্তেগফার বাংলা উচ্চারণ ও ফজিলতসহ 

আরো পড়ুনঃ জানাযার নামাজের পূর্ণ নিয়ম ও দোআ সমূহ বাংলা উচ্চারণসহ 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *