শাওয়াল মাসের ৬ রোজা র ফজিলত ও তাৎপর্য

শাওয়াল মাসের ৬ রোজা র ফজিলত | ও তাৎপর্য

শাওয়াল অর্থ কি?

 

“শাওয়াল” এটি একটি আরবী শব্দ ও আরবী ১২ মাসের অনেক মাহাত্মময় একটি মাস যার অর্থ উঁচু করা, উন্নত করা, পূর্ণতালাভ করা, পাল্লা ভারী হওয়া, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া; প্রার্থনায় হস্ত উত্তোলন করা, এই অর্থ গুলোর প্রতিটির সঙ্গেই শাওয়াল মাসের খুব গভীর সম্পর্ক রয়েছে।কেননা এই মাসের আমলের দ্বারা বান্দার উন্নতি লাভ হয় তার প্রভুর কাছে। নফল আমল শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখার দ্বারা তার নেকির পাল্লা ভারী হয়।শাওয়াল মাসে বান্দা আরো কল্যাণের আশায়  আল্লাহর কাছে মিনতির হাত সম্প্রসারিত করে প্রার্থনা করে, এবং রমজানে পূর্ণ এক মাস রোজা পালনের পর আরও ৬ টি রোজা রেখে সে প্রাপ্তির আনন্দে বিভোর হয়।

ফরজ রোজা পালন শেষে নফল রোজার প্রতি মনোনিবেশ করে কামশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি অর্জন করে। এসবই হলো শাওয়াল শব্দের যথার্থতা।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে নফল আমলের প্রতি তার হাবীব রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  সূরায়ে ইনশিরাহে আদেশ করে বলেন।

 

قوله تعالى: فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ • وَإِلٰى رَبِّكَ فَارْغَبْ

 

হে নবী আপনি যখন ‘ফরজ’ দায়িত্ব সম্পন্ন করবেন তখন উঠে দাঁড়াবেন এবং আপনি (নফলের মাধ্যমে) আপনার প্রভুর প্রতি অনুরাগী হবেন।’ (সুরা-৯৪ ইনশিরা, আয়াত: ৭-৮)।

 

 

শাওয়াল মাসের বিশেষ ফজিলত

শাওয়াল মাস ইসলামি হিজরী মাসগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এ মাসের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। আরবি চন্দ্র মাসের দশম মাস হলো শাওয়াল মাস।

এটি পবিত্র হজ্বের মওসুমের তিন মাসের (শাওয়াল, জিলক্বদ, জিলহজ্ব) সর্বপ্রথম ও আগাম বার্তাবাহক মাস।

এই মাসের প্রথম তারিখে মুসলিমদের বড় দুটি আনন্দ উদযাপনের মধ্যে বড় একটি আনন্দ উদযাপন করা হয় আর তা হলো ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ,

শাওয়ালের প্রথম দিন সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা এবং ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব।

এই মাসের মাহাত্ম বৃদ্ধি পায় ইসলামের বড় বড় রোকন গুলোর সম্পৃক্ততার ফলে,

কারণ এই মাসের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে হজ্ব, ঈদুল ফিতর, সদকায়ে ফিতর ও জাকাতের।

এবং এই মাসের ৭ তারিখে তৃতীয় হিজরি সনে (২৩ মার্চ ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে) ওহুদ যুদ্ধে বিজয় হয়েছিল।

এই মাস নেক আমল ও ইবাদতের জন্য অত্যন্ত উর্বর ও উপযোগী।এই জন্যই এই মাসের ইবাদাত ও নেক আমলের রয়েছে আলাদা সাওয়াব মাহাত্মতা।

 

 

শাওয়াল মাসের ৬ রোজার ফজিলত ও তাৎপর্য

শাওয়াল মাসের ৬ রোজা র ফজিলত ও তাৎপর্য

শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখা সুন্নাত। এই প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

 

عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.  مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتَّةَ أَيَّامٍ مِنْ شَوَّالٍ، فَكَأَنَّمَا صَامَ الدَّهْرَ كُلَّهٌ •

 

নবী কারীম (সা.) বলেন, যে মু’মীন বান্দা রমজানের রোজা পালন করে শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন পূর্ণ বছরই রোজা পালন করল।

অর্থাৎ সে রমজানের সাথে এই ৬ টি রোজা পালনের মাধ্যমে পূর্ণ এক বছর নফল রোজা পালনের সাওয়াব পাবে।

তথ্যসূত্র : সহীহ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ১১৬৪; আবুদাউদ: হাদীস নং ২৪৩৩

 

প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কমপক্ষে ১০ গুণ করে দিয়ে থাকেন।

চন্দ্র মাস হিসেবে বছর পূর্ণ হয় তিনশত চুয়ান্ন বা তিনশত পঞ্চান্ন দিনে।

এই হিসাবের প্রতি লক্ষ্য করলে জানা যায় যে, রমজান মাস তথা এক মাসের (৩০ দিনের) রোজা ১০ গুণ হয়ে তিনশত দিনের সমান হয়।

অবশিষ্ট চুয়ান্ন বা পঞ্চান্ন দিনের জন্য আরও ছয়টি  রোজার প্রয়োজন হয়,

যা আমরা শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখার দ্বারা একটি বছরকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করার চেষ্টা করি।

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ব্যাপারে আরও বলেছেন,

‘আল্লাহ তাআলা শাওয়াল মাসের ছয় দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।

সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসের ছয় দিন রোজা রাখবে,

আল্লাহ তাআলা তাকে প্রত্যেক সৃষ্ট জীবের সংখ্যার সমান নেক-সাওয়াব দান করবেন,

সমপরিমাণ তার গুনাহ মুছে দেবেন এবং পরকালে তার মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন।

 

শাওয়াল মাসের ৬ রোজা কখন রাখা লাগে?

শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখার জন্য এই মাসের নির্দিষ্ট কোনো দিন বা সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট করে দেন নাই,

বরং এই মাসের ২৯/৩০ দিনের যে কোন ৬ দিন এই ৬টি রোজা রাখা যাবে।

এবং এতে লাগাতার ৬ দিন ৬ রোজা রাখার কোন শর্তারোপ নেই,

বরং নফল রোজা পালনকারী চাইলে ১ দিন রোজা রেখে ২/১ রোজা ভঙ্গ করে আরেকদিন রোজা রাখতে পারবে।

এভাবে চাইলে সে একদিন একদিন করে পুর্ণ মাসে ৬ টি রোজা পালন করতে পারবে।

 

বিশেষ মাসআলা ১:

 রোজার নিয়তের ক্ষেত্রে শুধু রমজান মাসের রোজা ছাড়া বাকী নফল ও ওয়াজিব রোজার নিয়ত সাহরীর সময়ের মধ্যেই তথা: ফজরের আগেই করতে হয়।

হ্যাঁ কোনো ব্যক্তি যদি গুমানোর আগে নফল রোজা রাখার দৃঢ সংকল্প করে এবং কোনো কারণে ভোর রাতে সাহরী করতে পারে তাহলেও তার রোজা হয়ে যাবে।

জেনে রাখা জরুরী যে সাহরী খাওয়া সুন্নাত সাহরী খাওয়া ছাড়াও যদি রোজার নিয়ত করা হয় তাহলে রোজ হয়ে যায়।

এতে রোজার এবং সাওয়াবের কোনো কমতি করা হয় না।

তথ্যসূত্র : ফাতওয়ায়ে শামী ।

 

বিশেষ মাসআলা ২:

মহিলা কিংবা মুসাফির ও  অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য রমজান মাসে ছুটে যাওয়া কাজা রোজা পরবর্তী রমজান মাস আসার আগে যেকোনো সময় আদায় করার সুযোগ ও অনুমতি রয়েছে।

রমজানের কাজা রোজা রাখার জন্য সময় সংকীর্ণ হলে তার আগে নফল রোজা রাখা বৈধ ও শুদ্ধ।

সুতরাং রমজানের ফরজ রোজা কিংবা অন্য কোন ওয়াজিব রোজার কাজা করার আগে নফল রোজা রাখা যাবে।

তবে এই ক্ষেত্রে সম্ভব হলে আগে ফরজ ও ওয়াজিব রোজার কাজা আদায় করাই উত্তম।

তথ্যসূত্র: ফাতাওয়ায়ে ইসলামিয়্যাহ দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা নং ১৬৬

হজরত আয়িশা (রা.) বলেন, ‘আমার ওপর রমজানের যে কাজা রোজা বাকি থাকত,

তা পরবর্তী শাবান ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না।

তথ্যসূত্র: সহীহ বুখারী শরীফ হাদিস নং ১৯৫০ সহীহ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ১১৪৬

শাওয়াল মাসে বিয়ে-শাদীর রেওয়াজ!

উপরোল্লেখিত হাদিসের ভাষ্যমতে, শাওয়াল মাসে বিয়ে-শাদি সুন্নাত, যেমনিভাবে শুক্রবারে জামে মসজিদে ও বড় মজলিশে আকদ অনুষ্ঠিত হওয়া সুন্নাত।

কারণ মুসলিম উম্মাহর মা হযরত আয়েশা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক রা: এর বিয়ে শাওয়াল মাসের শুক্রবার দিন মসজিদে নববীতেই হয়েছিল।

শুভ কাজের শুভসূচনার জন্য এ মাস খুবই উপযোগী।

এই মাসের মাহাত্মের প্রতি লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মবর্ষ শুরু করে থাকে।

বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ মাসেই তাদের শিক্ষাবর্ষের নতুন ভর্তি ও নব পাঠদান শুরু করে।

এই শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখা রমজানের রোজা কবুল হওয়ারও পরিচায়ক ও বটে

কারণ আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার আমল কবুল করে,

এবং তাকে ভালোবাসে তখন ভালো ও কল্যাণকর কাজগুলো বেশী বেশী করার তাওফীক দান করেন।

তাই আমাদের উচিৎ রমজানে সিয়াম সাধনার পর পবিত্র শাওয়াল মাসেও নামাজ, ৬ রোজা, কোরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

সাথে বাকি ১১ মাসও কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ও অন্যান্য ইবাদাতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।

আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখার তাওফীক দান করুন।

আমীন !! আমীন!!

 

আরো ইসলামিক পোস্ট পড়ুন।

রমজান মাসে ওমরা পালনের ফজিলত ।

ইস্তিগফারের ১১টি দোয়া শিখুন হাদিস ও কুরআন মাজীদ থেকে

 

6 thoughts on “শাওয়াল মাসের ৬ রোজা র ফজিলত | ও তাৎপর্য”

  1. মোহাম্মাদ মীর হোসাইন

    মাশাল্লাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

  2. মমিনুল ইসলাম

    সাওয়াল মাসের রোজা গুলো রাখা হয়না। রোজা গুলো রাখতে হবে।

  3. Pingback: ছোটদের ইসলামিক গল্প | নবীজীর বরকত

Leave a Comment

Your email address will not be published.